লাতভিয়া

লাটভিয়া

সাধারণত বাল্টিক সাগরে প্রবেশ রয়েছে যে দেশগুলো সেগুলোকে বাল্টিক প্রজাতন্ত্র বলে। দেশগুলো হচ্ছে ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া, পোল্যান্ড, রাশিয়া ও সুইডেন। তবে ফিনল্যান্ড থেকে পোল্যান্ডের মাঝের তিনটি দেশ এস্তোনিয়া, লাটভিয়া ও লিথুয়ানিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বাল্টিক প্রজাতন্ত্র বলে স্বীকৃত। এর কেন্দ্রভাগের দেশটির নাম লাটভিয়া। এর উত্তরে এস্তোনিয়া, দক্ষিণে লিথুয়ানিয়া, পূর্বে বিশাল দেশ রাশিয়া ও বাইলো রাশিয়া। পশ্চিমে বিস্তৃত রয়েছে বাল্টিক সাগর। সাগর পাড়ি দিয়ে আরো পশ্চিমে গেলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ সুইডেন। বাল্টিক সাগর এ অঞ্চলের জনবসতিতে রেখেছে বিরাট প্রভাব। স্বাধীন দেশ লাটভিয়ার ভাষা সংস্কৃতির সাথে এ অঞ্চলের অন্য দু’টি দেশ এস্তোনিয়া ও লিথুয়ানিয়ার রয়েছে দারুণ মিল ।

প্রাচীন ‘লাটগালিয়ান’ শব্দ থেকে লাটভিয়া নামটির উৎপত্তি। এটি বাল্টিক সাগরের তীরে গড়ে ওঠা চারটি উল্লেখযোগ্য উপজাতি গোষ্ঠীর একটি। মূলত এ উপজাতি গোষ্ঠী থেকেই লাটভিয়া দেশটির সম্প্রসারণ। পর্যায়ক্রমে দেশটি জার্মান, পোলিশ, সুইডিশ ও রাশিয়ানদের দ্বারা শাসিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি স্বাধীন দেশে হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ক’দিনের মাথায় রাশিয়া আবার এটি দখল করে নেয়। ১৯৯১ সালে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পতনের পর দেশটি চূড়ান্তভাবে স্বাধীনতা পায়। এর পরপরই দেশটি ইউরোপীয় সংস্থা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সামরিক জোট ন্যাটোর সদস্যপদ পায়।ন্যাটো দেশটির আকাশসীমা রক্ষায় সেখানে নিয়মিত টহলের ব্যবস্থাও করেছে।

খ্রিষ্টজন্মের ৯ হাজার বছর আগে থেকে লাটভিয়া নামের বর্তমান দেশটিতে মনুষ্যবসতির প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে খ্রিষ্টপূর্ব ৩ হাজার সালের আগে এলাকাটি জমে ওঠেনি। আরো প্রায় ৪ হাজার বছর পর এ অঞ্চলের জনমিতিতে বড় পরিবর্তন দেখা দেয়। তখন চারটি উপজাতি বসতি দেখা যায়। এরা কুউরি, ল্যাটগালি, সেলি ও জেমগালি নামে পরিচিত। সবারই ছিল আলাদা সংস্কৃতি ও কৃষ্টি। পরে চারটি স্বতন্ত্র ধারায় এর বিকাশ ঘটতে দেখা যায়। প্রাচীনকাল থেকে বাল্টিক সাগরের তীরের দেশটি ইউরোপীয়দের জন্য ছিল বেশ অকর্ষণীয়। বিশেষত সাগর তীরের হলুদাভ বাদামি পাথর পাওয়া যেত। এগুলো অত্যন্ত মূল্যবান অলঙ্কার উপাদান হিসেবে ইউরোপে সমাদৃত ছিল। প্রাচীন রোম ও গ্রিসে এরা এই পাথর রফতানি করত উচ্চ দামে। বর্তমানেও লাটভিয়ার স্বর্ণালঙ্কারে এ পাথরের বহুল ব্যবহার দেখা যায়।

খ্রিষ্টান মিশনারিরা ১১৮০ সালে লাটভিয়ায় আসে। এ সময় লাটভীয়রা দেবদেবীর পূজা করত। জার্মানি থেকে আগত খ্রিষ্টানরা ক্রমেই তাদের এ ধর্মে দীক্ষা দেয়। ১২০০ সালে তারা জার্মান সরকারের অধীনে রীতিমতো লিভোনিয়া নামের একটি নতুন রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে। প্রতিবেশী এস্তোনিয়ার দক্ষিণ অংশ এই রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাজধানী রিগা তখন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। পূর্ব ইউরোপের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছিল। ১৫০০ সালে এখানকার অদিবাসীদের মধ্যে আবার একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি অঞ্চলটির কর্তৃত্ব চলে যায় পোল্যান্ডের কাছে। অষ্টাদশ শতকের শুরু পর্যন্ত লিভোনিয়া নামক অঞ্চল দখলের ত্রিমুখী লড়াই চলে পোল্যান্ড, সুইডেন ও রাশিয়ার মাঝে। একটা সময় সুইডিশরা এর কর্তৃত্ব পায়। তারা কৃষকদের শিক্ষাদীক্ষার জন্য স্কুল স্থাপন করে। অঞ্চলটি আবার জার্মানদের দখলে আসে। দীর্ঘদিন জার্মান দখলের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দানা বাঁধে। ১৯৪০ সালে হিটলারের সাথে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট স্টালিনের এক চুক্তিবলে রাশিয়া দেশটি গ্রাস করে নেয়। কিন্তু ১৯৪১ সালেই হিটলারের বাহিনী দেশটি দখল করে নেয়।

১৯৪৪ সালে রাশিয়া লাটভিয়াকে আবার দখল করে। রাশিয়ার শাসনে দেশটিতে ব্যাপক শিল্পায়ন ঘটে। একই সাথে লাটভিয়ায় বসতি স্থাপন করে হাজার হাজার রাশিয়ান। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে তারা লাটভিয়া থেকেও সরে আসে। তবে দেশটির সামাজিক জীবনে রাশিয়ানরা ব্যাপক প্রভাব রেখে যায়। জনসাধারণের এক-চতুর্থাংশ রাশিয়ান ভাষায় কথা বলে।

একনজরে লাটভিয়া
দেশের নাম - রিপাবলিক অব লাটভিয়া
জনসংখ্যা - ২৩ লাখ
রাজধানী - রিগা
আয়তন - ৬৪ হাজার ৫ শত ৮৯ বর্গকিলোমিটার
প্রধান ভাষা - লাটভিয়ান, রাশিয়ান
ধর্ম - খ্রিষ্টান
গড় আয়ু - ৬৭ বছল (পুরুষ), ৭৮ বছর (মহিলা)
মুদ্রা - লাট
প্রধান রফতানিদ্রব্য - কাঠ নির্মিত আসবাবপত্র, মাছ ও মাছ থেকে উৎপন্ন পণ্য
মাথাপিছু আয় - ৯ হাজার ৯৩০ ডলার

১৯২২ সালে দেশটির সংবিধান প্রণীত হলেও ১৯৯১ সালের আগে তা কার্যকারিতা পায়নি। রাষ্ট্রপ্রধান হচ্ছেন দেশের প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন সংসদ সদস্যরা। চার বছরের জন্য তিনি নির্বাচিত হন। সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী। তাকে মনোনয়ন দেন প্রেসিডেন্ট। এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদের সদস্যসংখ্যা ১০০। তারাও চার বছরের জন্য নির্বাচিত হন। ছোট দেশটিতে ২০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল রয়েছে।

২০০০ সাল থেকে লাটভিয়া ইউরোপের একটি অন্যতম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত হয়। ২০০৬ সালে তাদের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় প্রায় ১২ শতাংশ। তবে মুদ্রাস্ফীতিও ছয় শতাংশের ওপরে। বেকারত্ব ছিল আট শতাংশের বেশি। সোভিয়েত আমলে সব কিছুতেই ছিল রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। এখনো বড় সব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সরকারের একটা বড় অংশ রয়েছে।

লাটভিয়ার আবহাওয়ায় বলকান উপসাগরের প্রভাব রয়েছে। সে কারণে বাতাসে আর্দ্রতা বেশি। গ্রীষ্মকালে উত্তপ্ত আবহাওয়া। শরৎ ও বসন্তে সামান্য উষ্ণ থাকে। অবস্থান উত্তর গোলার্ধের কাছে হওয়ায় শীতকালে দেশটিতে প্রচণ্ড শীত পড়ে। বৃষ্টি ও তুষারপাত হয় সারা বছরই। রাশিয়া থেকে তীব্র শীতল বাতাসও প্রবাহিত হয় বছরব্যাপী। সমতল ভূমির পরিমাণ বেশি। এখানকার জমি বেশ উর্বর। পূর্বাঞ্চলে কিছু পাহাড় রয়েছে। দেশটি ২৬টি জেলায় বিভক্ত। রয়েছে সাতটি শহর। এগুলোর শাসনব্যবস্থা কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। উন্নয়ন ও অর্থনীতির স্বার্থে সরকার দেশটিকে পাঁচটি পরিকল্পিত এলাকায় বিভক্ত করেছে।

দেশটির সশস্ত্রবাহিনী গড়ে উঠেছে সুইডিশ-ফিনিস মডেলে। নিয়মিত সৈন্যসংখ্যা নগণ্য হলেও সশস্ত্র প্রশিক্ষণ রয়েছে বেশির ভাগ মানুষের। ২০০৭ সালে বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের আইন রহিত হয়। স্থল, নৌ ও বিমান তিনটি শাখাই রয়েছে। প্রায় ৯ লাখ মানুষ সশস্ত্রবাহিনীতে কাজ করার উপযুক্ত। শান্তিরক্ষায় তারা প্রতিবেশী এস্তোনিয়া ও লিথুয়ানিয়ার সাথে মিলে কাজ করে। ২০০৪ সালে লাটভিয়া ন্যাটো জোটে যোগ দেয়। এ জোট দেশটির আকাশসীমা রক্ষায় যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। জাতীয় আয়ের এক দশমিক দুই শতাংশ তারা সামরিক খাতে ব্যয় করে।

শিক্ষাদীক্ষায় দেশটি অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের সমকক্ষ। প্রাথমিক শিক্ষা চার বছরব্যাপী। মাধ্যমিক শিক্ষা আট বছর। ১ হাজারেরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার। শিক্ষকসংখ্যা ১১ হাজার। মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রসংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার। শিক্ষক রয়েছে ৩০ হাজারের মতো। ১৯৯৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশ করে উপযুক্ত শিশুদের ৯৩ শতাংশ। অন্য দিকে মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ৮৪ শতাংশ ভর্তি হয় ওই বছর। সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে উচ্চতর শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। কিছু বিশেষ বিষয়ে সরকার বিনা বেতনে উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ দেয়। ২০০০ সালের শুমারি অনুযায়ী ১৫ বছরের ওপরের জনসংখ্যার ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ পড়তে এবং লিখতে পারে। ১৯৯১ সালে শিক্ষা সংস্কারে একটি নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে দেশটি। তখন পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়।

ইউরোপীয় এ দেশেটির সংস্কৃতিতে উপজাতীয় প্রভাব রয়েছে। যেমন বিয়ের আগে এরা নিজেদের নিষ্পাপ করে নেয়ার একটি সামাজিক প্রথা এখনো অব্যাহত রেখেছে। তারা একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের সব পাপকে কোনো বস্তুর মধ্যে আরোপের মাধ্যমে নিজেরা পূতপবিত্র হয়। ঠিক বিয়ের আগে একটি আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে তা করা হয়। পূর্ব ইউরোপের আরো কিছু দেশে এখনো এ প্রথা প্রচলিত রয়েছে। কেউ অসুস্থ হলেও একই পদ্ধতিতে তারা সুস্থ হওয়ারও চেষ্টা করে। তবে ইউরোপীয় আধুনিকতার বিস্তারে বেশির ভাগ উপজাতীয় আচার এখন বিলুপ্তির পথে। পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে লাটভিয়ানদের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। অতি সযতে তারা এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। সাধারণত উৎসব-আয়োজনে সেসব জমকালো পোশাক পরা হয়। তা ছাড়া বিভিন্ন ঋতু এবং ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এদের পোশাক নির্ধারিত করা থাকে ঐতিহ্যগতভাবে। এসব পোশাক-আশাকের বেশির ভাগই রঙিন।

Don't Miss A Single Updates

Remember to check your email account to confirm your subscription.

Blogger
Disqus
Post a comment ➜

No Comment