ইয়েমেন

সন্ধ্যার আলো-অন্ধকারের এডেন যেন অন্য রকম আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল প্রকৃতিতে। এক প্রাচীন সভ্যতার জনপদকে আধুনিকতার ছোঁয়া কিভাবে অপূর্ব করে তুলতে পারে, শহরের প্রবেশস্থলের বেশ খানিকটা দূর থেকেই তা মোহিত করছিল সবাইকে। শহরের বুক চিরে আমাদের গন্তব্যস্থল শেরাটন হোটেলে যাওয়ার আগেই স্থির-নিশ্চল জলরাশির লেক অদ্ভুত এক নৈসর্গ তৈরি করে সানায় ইয়েমেনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরি কাজ থাকায় হোস্ট মুজিব ভাইকে এডেন ভ্রমণে সাথে পাইনি। এ অভাব দূর করতে ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত বাংলাদেশী আলমগীরকে সঙ্গী করে দেন তিনি। এক দিনের সফরে এডেনের সৌন্দর্য পরখ করা অসম্ভব এক ব্যাপার। তবু এডেনের শহর, বন্দর আর সৈকতের অপরূপ সৌন্দর্য আট ঘণ্টার আধা পাহাড়ি রাস্তা ঠেলে আসার কষ্টটুকু ভুলিয়ে দেয় আমাদের। শেরাটনে রাত কাটিয়ে এডেনের সৈকতে পৌঁছতে আমাদের বেশখানিকটা দেরিই হয়ে যায়। সকালের মিষ্টি রোদ ক্রমেই উত্তপ্ত হতে থাকে। সাথে সাথে এডেনের বালুকারাশিও গরম হয়ে ওঠে। এডেনের এই সৈকত সুবিশাল ও দীর্ঘ নয়। অনুত্তাল ঢেউগুলো সৈকতে আছড়ে পড়ার আগেই শান্ত হয়ে আসে। তবু এক পলক তাকিয়ে আমরা এডেন সামুদ্রিক প্রণালী ঘিরে তৈরি হওয়া ইতিহাসকেই স্মরণ করছিলাম। মঞ্জু ভাই, বাবু ভাই, রতন ভাই, শেখ নজরুল আমরা সবাই সানা ফিরে যাওয়ার তাগিদ খানিকটা ভুলেই এডেনের সৈকতে এক ঘণ্টার বেশি সময় কাটিয়ে দেই। এখানে সমুদ্রের বিশাল জলরাশির দিকে তাকাতে তাকাতে নানা স্মৃতি মনে পড়ে। মনে পড়ে বাংলাদেশের কথা, কক্সবাজারের দীর্ঘ বেলাভূমির কথা, নিউইয়র্ক, সানফ্রান্সিসকো, দুবাই এবং আটলান্টিকের তীরে গড়ে ওঠা আইভরিকোস্টের বাণিজ্যিক রাজধানী আবিদজানের সৈকতের কথা। সব সৈকতই যেন নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র-অনন্য। তবে এডেনটা যেন একটু অন্যরকম। পশ্চিমের সৈকতের মতো তারুণ্যের হালকা উচ্ছ্বাস নেই এডেনে। তবুও এডেন সৈকতের এক ঘণ্টার অবস্থান বেশ নস্টালজিক করে তুলেছিল আমাদের।

সংবাদপত্রের সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে বিশ্বের নানা দেশে বেড়ানোর অযাচিত সুযোগ এসেছে বিভিন্ন সময়। ইয়েমেনে যাওয়ার দাওয়াতটা কেন জানি একটু বাড়তি উচ্ছ্বাস ও আবেগ তৈরি করে আমার মধ্যে। কাউসার ভাই প্রথম ইয়েমেনে সফরের বিষয়টি জানান আমাকে। তার মেজ ভাই কে এম মুজিবুল হক ইয়েমেনের বাংলাদেশস্থ অনারারি কনসাল জেনারেল। ইয়েমেনের জাতীয় এয়ারলাইন্স ‘ইয়েমেনিয়া’র জিএসএ-টাও তার প্রতিষ্ঠানের। কাউসার ভাইয়ের সাথে পরিচয়টা আমার দীর্ঘদিনের। আমার স্ত্রীর নানা মুফতি মহিউদ্দিন বড়কাটরার বিশিষ্ট দ্বীনি ব্যক্তিত্ব পীরজি হুজুরের ভাগ্নে। এই পীরজি হুজুরের পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার সম্পর্ক মুরাদনগরের শাহ কায়কোবাদ পরিবারের। দুই পরিবারের পূর্বপূরুষরা ইসলাম বিস্তৃতির মিশন নিয়ে এ দেশে এসেছিলেন। এ সম্পর্কের বিষয়টি জানা হয় বেশ পর। ইয়েমেনে যাওয়ার আগে মুজিব ভাইয়ের সাথে কয়েক দফা ফোনে কথা হলেও অতটা ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়নি। ইয়েমেন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় এক সপ্তাহের সফরে যতই কাছ থেকে তাকে দেখেছি, ততই অসাধারণ এক বন্ধুবৎসল ব্যক্তিত্বের মানুষ মনে হয়েছে তাকে।

ইয়েমেনের মূল কর্মসূচি ছিল দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে। আমরা ১১ সাংবাদিকের এক প্রতিনিধিদল ছিলাম এ সফরে। সাংবাদিকের বাইরে মুজিব ভাই ছাড়া ছিলেন সার্ক চেম্বারের সহসভাপতি ও চট্টগ্রামের বিখ্যাত হোটেল আগ্রাবাদের মালিক হাকিম আলী। তিনি বাংলাদেশের হোটেল মালিক সমিতিরও গুরুত্বপূর্ণ নেতা। পোশাকি ভদ্রলোক ও সজ্জন ব্যক্তিত্ব তিনি। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিক প্রতিনিধিদলটির সমন্বয়ক ছিলেন দৈনিক ইনকিলাবের তদানীন্তন ডেপুটি এডিটর মঞ্জুরুল আলম আমার এক সময়ের চিফ রিপোর্টার। এখন তিনি ইসলামিক টেলিভিশনে নিউজের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। টিমের সাথে ছিলেন রাশীদ উন নবী বাবু ভাই কার্যনির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দৈনিক আমার দেশের আত্মপ্রকাশ এবং এটাকে এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পত্রিকায় পরিণত হওয়ার মূল কারিগর তিনি। এখন তিনি দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। সাথে ছিলেন রফিকুল ইসলাম রতন যাকে আমরা এভারগ্রিন বলতে বেশি পছন্দ করতাম। যুগান্তরের চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব থেকে সদ্য মুক্ত হয়ে তিনি ইয়েমেনে আসেন। দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার মাঈনুল আলমও ছিলেন এই সফরে। বাংলাদেশের তিন প্রধান চ্যানেলের ছয় সাংবাদিককে সাথে পাই এ সফরে। এর মধ্যে এটিএন’র শেখ নজরুল ছিলেন আসলেই অনন্য। পুরো সফরকে আনন্দময় রাখতে তার বিশেষ ভূমিকা ছিল। চ্যানেল আইয়ের সিনিয়র রিপোর্টার মাহবুব মতিন যে আসলেই এক উদীয়মান তারকা সাংবাদিক, তা বুঝতে পেরেছি ইয়েমেন এসে। সাদাসিধে চিন্তাশীল এক মিডিয়া কর্মী ছিলেন এনটিভি’র প্রযোজক শাহাবুদ্দীন। তবে তার পেছনে কেন যেন সার্বক্ষণিক লেগেই ছিলেন তার সহকর্মী ক্যামেরাম্যান হাসান হাফিজুর রহমান পুলক। সম্ভবত তাদের সম্পর্কের গভীরতার কারণে এটাওটা নিয়ে খুনসুটি লেগেই থাকত। এটিএন’র ক্যামেরাম্যান মিনহাজ মোসলেম আর চ্যানেল আই’র ইমাম হোসেন লবনের আবশ্যিক মজা ছড়িয়েছেন পুরো সফরে। সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের পুরো সফরের কোনো ঘাটতিই যেন থাকতে দেয়নি মুজিব ভাইয়ের সার্বক্ষণিক তদারকি। গুণই মানুষকে মহান করে মুজিব ভাই সম্পর্কে মঞ্জু ভাইয়ের এ মতে যে কোনো মেদ ছিল না, তা সানার বিমানে ওঠার আগে থেকেই উপলব্ধি করতে শুরু করি।

বন্ধন অনেক পুরনো

বাংলাদেশের মানুষ সৌদি আরব আর ইয়েমেনের সাথে আত্মার বন্ধনটা খানিকটা বেশিই অনুভব করে। মুসলিম বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক জনপদ বাংলাদেশ। মুসলিম বিশ্বের মানচিত্র দেখলে এই জনপদে ইসলাম কিভাবে ছায়া বিস্তার করল, তা ভেবে বাইরের অনেকেই অবাক হন। এই অবাক করা ঘটনার সাথেই যুক্ত ইয়েমেনি দরবেশরা। ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ১৭ জন ঘোড়সওয়ার নিয়ে বঙ্গ বিজয়ের বেশ আগেই ইয়েমেনি সুফি সাধক হজরত শাহজালাল, শাহ মাখদুম, শাহ পরান, শাহ আমানতসহ তিন শতাধিক সুফি বাংলাদেশে ইসলামের বার্তা নিয়ে আসেন। সুফিবাদের শান্তি ও আধ্যাত্মিকতার অমিয় বাণী প্রচারের সাথে সাথে তারা জমিদারদের শোষণ থেকে মুক্ত করতে যুদ্ধও করেছেন। এভাবে এক শান্তিময় সমাজের রূপরেখা ইয়েমেনি সুফিরা আগেই রেখেছিলেন বলে বখতিয়ার খিলজির আগমনকে স্বাগত জানিয়ে সেন রাজাদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের মানুষ।

ইয়েমেনে পৌঁছার আগেই এসব ইতিহাস স্মৃতি নানাভাবে চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। মুজিব ভাইয়ের গাইড অনুযায়ী আমরা কিছুটা সময় থাকতেই জিয়া বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জে একত্র হই। ইমিগ্রেশনের যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করার জন্য লোকজন তিনি আগে থেকেই ঠিক করে রাখেন। যথাসময়ে আকাশে উড়াল দেয় ইয়েমেনিয়া। সুপরিসর বিমানটির ব্যবস্থাপনাও বেশ ভালো। ছয় ঘণ্টার বিমান ভ্রমণটা ক্লান্তিমুক্ত হয় আমাদের নানা গল্প-গুজবে। সবকিছুর সমন্বয়ক সেই মুজিব ভাই। সানায় বিমান অবতরণের পরই ইয়েমেনিয়ার কয়েকজন কর্মকর্তা আমাদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষায় থাকেন। যথারীতি কুশল বিনিময়ের পর সানার সর্বাধুনিক হোটেল ‘মোভেন পিক’-এ নিয়ে যাওয়া হয় আমাদের। এ হোটেলেই ইয়েমেনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। শুমশাম আধুনিক হোটেল। অনুষ্ঠানের আয়োজনও সে রকমই। হোটেলটির নির্মাণকাজ পুরোটা শেষ না হলেও অসাধারণ করে গড়ে তুলতে সযতœ প্রচেষ্টা উদ্যোক্তাদের। সৌদি-ইয়েমেন যৌথ বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এটি। ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ফরাসি একটি কোম্পানি।

সানার সংবর্ধনা

ইয়েমেনে আমাদের সফরের মূল কর্মসূচি ছিল সানায়। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত বছর (২০০৬) ২৬ আগস্ট সানায় বাংলাদেশে নিযুক্ত ইয়েমেনের অনারারি কনসাল জেনারেল এই সংবর্ধনার আয়োজন করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্কে আবার মেলবন্ধন তৈরি করা। বেলা ১১টা বাজতেই আমন্ত্রিত অতিথিরা একে একে হাজির হতে থাকেন। ইয়েমেনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে উপস্থিত হন সরকারের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন এটিএন’র শেখ নজরুল ইসলাম। সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন মঞ্জু ভাই ও বাবু ভাই। চমৎকার বক্তব্যে বাংলাদেশকে তুলে ধরেন অনারারি কনসাল জেনারেল কে এম মুজিবুল হক। তার ইয়েমেনি পূর্বপুরুষের কথা, বাংলাদেশের মানুষের ইয়েমেনের সাথে আত্মিক বন্ধনের কথা, ইয়েমেনের সাথে বাংলাদেশের যৌথ ব্যবসায়-বিনিয়োগ ও জনশক্তি আদান-প্রদানে সহযোগিতার নানা দিক তুলে ধরেন তিনি। এভাবে দুই ঘণ্টা ধরে অনুষ্ঠিত হয় সংবর্ধনার আলোচনা ও মধ্যাহ্নভোজ।

অনুষ্ঠানে ইয়েমেনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রতি তার সরকারের আগ্রহের বিষয়টি ফুটে ওঠে। একই মনোভাবের প্রতিফলন ঘটান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ইয়েমেন সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ইয়েমেন সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান ড. আবদুল হাদি আল হামদা, ঢাকায় নিযুক্ত ইয়েমেনের অনারারি কনসাল জেনারেল কে এম মুজিবুল হক, সার্ক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহসভাপতি হাকিম আলী, সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সদস্য রাশীদুন নবী বাবু ও মঞ্জুরুল আলম বক্তব্য রাখেন। বাংলাদেশের সাথে ইয়েমেনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করে ইয়েমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আবু বকর আবদুল্লাহ আল কিরবি ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে একটি অভিন্ন বাজার গড়ে তুলতে পারলে তা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতাকে অনেক বেশি কার্যকর করবে বলে মত প্রকাশ করেন। তিনি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ ও ইয়েমেনের অভিন্ন স্বার্থের কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এ দুটি দেশ বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে পারে। তার দেশ বিনিয়োগের জন্য এক মুক্ত এলাকা প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা করছে বলে উল্লেখ করে বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের সেখানে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানান।

ইয়েমেনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশী সাংবাদিকদের সাথে অনুষ্ঠানস্থলেই মতবিনিময় করে দুই দেশের সম্পর্কের বন্ধনকে আরো দৃঢ় করার অঙ্গীকার করেন।

ইয়েমেনের অনারারি কনসাল জেনারেল কে এম মুজিবুল হকের সাথে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী আবদুল কাদের বেগ আনমল পরদিন ২৭ আগস্ট দুই দফায় দীর্ঘ সময় ধরে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। ইয়েমেনি প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সাথে বাণিজ্যিক, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে কিভাবে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। দুই দেশের মধ্যে নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্পর্ক জোরদার হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশ-ইয়েমেন যৌথ চেম্বার অব কমার্স গঠনের বিষয় নিয়েও কথা হয় তাদের মধ্যে।

আমাদের হোটেলটি ছিল সানার আধুনিক শহরের কাছে। এর অদূরেই ইয়েমেনের প্রধানমন্ত্রীর অফিস। কাছাকাছি আমেরিকান দূতাবাসসহ বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন। আমাদের সফরের অল্প কিছু দিন পর সেপ্টেম্বরেই আরো সাত বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ। প্রেসিডেন্ট যে নতুন এক মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হচ্ছেন তা মোটামুটি সবারই জানা ছিল। দুই ইয়েমেনকে একত্র করার নায়ক ছিলেন আলী আবদুল্লাহ সালেহ। সংযুক্তির আগে উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি।

ইতিহাস অনেক পুরনো

ইয়েমেনের রাজনৈতিক ইতিহাস অনেক পুরনো। বিশ্বের সব চেয়ে পুরনো সভ্যতার একটির বিকাশ ঘটে এখানে। খ্রিষ্টপূর্ব ৯ শতক থেকে খ্রিষ্টাব্দ ৬ শতক পর্যন্ত দেশটি সাবীয়, আসানীয়, মিনায়ী, হজরে মাউতসহ বিভিন্ন রাজ্যের অংশ ছিল। এ সময়ই ছিল পুরনো সভ্যতার বিকাশকাল। মুসলিম শাসকরা পরে এটাকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যান। ষষ্ঠ দশকের শেষ এবং সপ্তম দশকে সাদ মা’রিফ বা মারিফ বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর বহুসংখ্যক সাবীয় ইয়েমেনের বাইরে এবং উত্তর আফ্রিকা ও আরব উপদ্বীপের উত্তর দিকে চলে যায়। সপ্তম শতকে ইসলামের খলিফারা এখানে শাসন কায়েম করেন। এই খেলাফত ভেঙে যাওয়ার পর জায়েদি শিয়া ইমামরা উত্তর ইয়েমেনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। একাদশ শতকে মিসরীয় সুন্নি খলিফারা উত্তর ইয়েমেনের আধিকাংশ এলাকায় কর্র্তৃত্ব স্থাপন করে। ষোড়শ শতক এবং আবার ঊনবিংশ শতকে তুর্কি খেলাফতের নিযন্ত্রণে চলে যায় ইয়েমেন।

১৯৯৮ সালে উত্তর ইয়েমেন অটোমান সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং ১৯৬২ সালে এটি পরিণত হয় একটি প্রজাতন্ত্রে। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে উত্তর ইয়েমেনে অটোমান শাসন নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর নিয়ন্ত্রণ মূলত শহরকেন্দ্রগুলোতে সীমিত ছিল। জায়েদি ইয়ামদের শাসন স্বীকৃত ছিল আপার ইয়েমেনে। ১৯১৮ সালে তুর্কি বাহিনী প্রত্যাহার করা হলে ইমাম ইয়াহিয়া মুহাম্মদ মুতাওয়াক্কালিত ‘কিংডম অব ইয়েমেন’ সৃষ্টি করে তার নিয়ন্ত্রণকে সংহত করেন। ইয়েমেন ১৯৪৫ সালে আরব লিগ এবং ১৯৪৭ সালে জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৪৮ সালে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে ইমাম ইয়াহিয়া মারা যান এবং তার পুত্র আহমদ বিন ইয়াহিয়া ক্ষমতাসীন হন। দক্ষিণে ব্রিটিশ উপস্থিতি এবং আরব জাতীয়তাবাদীদের প্রতি মিসরের জামাল আব্দুল নাসেরের সমর্থন, গেরিলা উত্থানসহ নানা কারণে সঙ্ঘাত ও অশান্তি বাড়তে থাকে ইয়েমেনে। ১৯৬২ সালে ইমাম আহমদ মৃত্যুবরণ করেন। এর অব্যবহিত পরেই বিপ্লবী বাহিনীর দ্বারা ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ আল বদর ক্ষমতাচ্যুত হন। বিপ্লবী বাহিনী সানার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে। মিসর তাদের সেনা দিয়ে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে। অন্যদিকে সৌদি আরব ও জর্দান বদরের অনুগত বাহিনীকে সাহায্য করে নবগঠিত প্রজাতন্ত্রের বিরোধিতা করে। এভাবে উত্তর ইয়ামেনে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়। ১৯৬৭ সালে মিসরীয় সৈন্য প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত থেমে থেমে সঙ্ঘাত চলতে থাকে। ১৯৬৮ সালে রাজ অনুগতরা সানা দখল করে এবং বিরোধিতাকারী অধিকাংশ নেতা সমঝোতায় উপনীত হন। ১৯৭০ সালে সৌদি আরব ইয়েমেন প্রজাতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেয়।

দক্ষিণ ইয়েমেনে ব্রিটিশ স্বার্থসংশ্লিষ্টতা সৃষ্টি হয় ১৮৩২ সালে ব্রিটিশ ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি জোর করে এডেন বন্দর দখল করার পর। ভারতে বাণিজ্যিক যাত্রার পথে এখানে জাহাজের একটি কোলিং স্টেশন স্থাপনের জন্য তারা এডেন দখল করে। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল খুলে দেয়ার পর এখানকার ব্রিটিশ দখলদারিত্ব রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব লাভ করে। এডেন ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসেবে শাসিত হয়। এরপর এডেন হয়ে যায় ব্রিটিশ উপনিবেশ। এই এডেনের পশ্চাৎভূমি ও হজরে মাউত নিয়ে পরে দক্ষিণ ইয়েমেন গঠিত হয়। এডেন-বহির্ভূত দক্ষিণ ইয়েমেনের বাকি অংশ সরাসরি এডেন-শাসিত না হলেও প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পরোক্ষভাবে ব্রিটিশদের দ্বারাই এ অঞ্চল নিয়ন্ত্রিত হতো। ঊনবিংশ শতকের শেষ দশক থেকে শুরু করে বিশ শতক পর্যন্ত সালতানাত আমিরাত ও শেখদের মধ্যে প্রশাসনিকভাবে বিভক্ত ছিল এতদঞ্চল। পুরো এলাকাকে প্রধানত পূর্ব এডেন প্রতিরক্ষা ও পশ্চিম এডেন প্রতিরক্ষা দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। প্রথম ভাগে হজরে মাউতের তিনটি স্টেট এবং শেষোক্ত ভাগে বাকি রাজ্যগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসেরের নেতৃত্বে ব্রিটেনের আরব উপনিবেশগুলোতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু হলে বিগত শতকের ষাটের দশকব্যাপী দ্বন্দ্বসঙ্ঘাত লেগে থাকে দক্ষিণ ইয়েমেনে। এ সময় মিসর ও সৌদি আরব সমর্থিত বিভিন্ন গেরিলা গ্রুপ সক্রিয় ছিল এখানে। মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্রে দিক্ষিত কিছু গোষ্ঠীও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে যোগ দেয়। এভাবে দীর্ঘ সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের এক পর্যায়ে ১৯৬৯ সালে মার্ক্সবাদী এনএলএফ ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং ১৯৭০ সালের ১ ডিসেম্বর দেশটির নাম দেয় পিপলস ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব ইয়েমেন। এরপর সব রাজনৈতিক দলকে ইয়েমেনি সোস্যালিস্ট পার্টিতে একীভূত করে এটাকে একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ সময় শাসকরা সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, কিউবা ও কট্টরপন্থী ফিলিস্তিনিদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে।

উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের মধ্যে দুই জার্মানির মতো বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক চলতে থাকলে ১৯৭২ সালে দুই ইয়েমেনের সংযুক্তির ঘোষণা দেয়া হয়। আরব লিগের হস্তক্ষেপে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ হয় একাধিক সময়ে। অবশেষে ১৯৭৯ সালে দুই ইয়েমেনের একত্রীকরণ শীর্ষক আলোচনা শুরু হয় কুয়েতে। ১৯৮০ সালে দক্ষিণ ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আবদুল ফাত্তাহ ইসমাইল ইস্তফা দিয়ে নির্বাসনে চলে যান। তার উত্তরসূরী আলী নাসির মোহাম্মদ ক্ষমতা নিয়ে প্রতিবেশী উত্তর ইয়েমেন ও ওমানের সাথে বিরোধ মিটিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেন। ১৯৮৬ সালে আলী নাসের ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ইসমাইল সমর্থকদের মধ্যে রক্তাক্ত সংঘর্ষ বাধে। এতে আলি নাসির ক্ষমতাচ্যুত হন আর মৃত্যুবরণ করেন ফাত্তাহ ইসমাইল। এরপর ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত একত্রীকরণ আলোচনা শেষে দুই ইয়েমেন একীভূত হয়। এর মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার ফলে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে মার্কিন একক কর্তৃত্ব বিস্তার করে বিশ্ব ব্যবস্থায়।

এডেন থেকে সানা

এডেনের সড়ক জনপদ সৈকতে ঘুরতে ঘুরতে এসব ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল আমাদের মধ্যে। এডেন ও সানার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সঙ্ঘাতে যেমন ভিন্ন মাত্রা রয়েছে, তেমনি এডেনের দৃশ্যপটটাও যেন ভিন্ন। অনেকটা আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিন্যস্ত সবকিছু। শহর সংলগ্ন পোতাশ্রয়, ছোট ছোট পাহাড় ঘেঁষা ভবন, শহরের কেন্দ্রস্থল, আধুনিক হোটেলের সমাহার সর্বোপরি এডেন বন্দরের বাণিজ্যিক নৌবহরের সদা ব্যস্ত আসা-যাওয়া এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে এডেনকে।

২৭ আগস্ট হোটেল শেরাটনে রাত যাপন করে আমাদের আবার সানায় ফিরে যাওয়ার কর্মসূচি নির্ধারণ করা আছে। এডেনে ভ্রমণের সময়টাকে কিছুটা দীর্ঘায়িত করার জন্য মুজিব ভাই সানা থেকেই চেষ্টা করেন আমাদের জন্য বিমান টিকিটের ব্যবস্থা করার। কিন্তু এক সাথে ইয়েমেনিয়ায় আটটি টিকিট না পাওয়ায় সেই সড়ক পথেই আবার ফিরতে হয় সানায়।

এডেন-সানা সড়কের দুই পাশে পাথরের সারি সারি পাহাড় যেমন রয়েছে তেমনি কাদ চাষের সযতœ পরিচর্যায় দেখা যায় ইয়েমেনি চাষিদের। কিছু দূর পর পরই রাস্তার পাশে মিষ্টি কদুর মতো ফল একধারে স্তূপ করে রাখা। ছোট শিশু-যুবক-বৃদ্ধ নানা বয়সী মানুষ দেখা যায় রাস্তার পাশে, লোকালয়, ব্যবসা কেন্দ্র ও ক্ষেত খামারে। এডেন থেকে সানার পথে অসমতল দীর্ঘ এলাকার যেখানে কৃষিচাষের মতো সমতল ভূমি ছিল তার অধিকাংশতেই দেখা গেছে কাদ চাষ। ‘কাদ’ হচ্ছে বাংলাদেশের চা গাছের সদৃশ্য একধরনের গাছ। সাধারণত এক থেকে পাঁচ মিটার দীর্ঘ হয়। পান চাষের মতো অত্যন্ত যতœ করে কাদ উৎপাদন করতে হয়। চা গাছের মতো শিখরের কচি ডগাটা সংগ্রহ করে উৎপাদকরা। সেটি ছোট ছোট আঁটি করে বিক্রি করে তারা। গোটা ইয়েমেনে ‘কাদ’ ব্যাপক জনপ্রিয় একটি বস্তু। নেশাজাতীয় গাছ হিসেবে সৌদি আরবসহ প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোতে এটি নিষিদ্ধ। ইয়েমেনিরা বেলা ১২টা না বাজতেই দুপুরে খাবারের পর কাদের আঁটি নিয়ে বসে একটার পর একটা পাতা মুখে পুরে। রস খেয়ে কাদের পাতার চিবানো অংশটুকু মুখের একপাশে জমা রাখে। এভাবে রাতের খাবার পর্যন্ত একনাগাড়ে চলে কাদ গ্রহণ। মাঝে শুধু নামাজের জন্য কাদ খাওয়া থেকে বিরত থাকে অনেকে। ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই নিজেদের দৈনন্দিন কাজের সাথে সাথে অথবা এক জায়গায় আড্ডা বসিয়ে কাদ খায়।

ইয়েমেনিদের মধ্যে কাদ যে কতটা বিস্তৃত হয়ে আছে, তা সাধারণ কেউ চিন্তাই করতে পারে না। খাদ্যের পেছনে একজন ইয়েমেনি যে অর্থ ব্যয় করে, তার চেয়ে বেশি খরচ হয় কাদে। ইয়েমেনি আর্থিক লেনদেনের এক-তৃতীয়াংশজুড়ে হয় কাদকে কেন্দ্র করে ।

Don't Miss A Single Updates

Remember to check your email account to confirm your subscription.

Blogger
Disqus
Post a comment ➜

No Comment